বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি: প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার আহ্বান

অষ্টম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষা এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা মোর্চা ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এই দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ না করে বরং প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এটি কার্যকর হলে দেশে একটি শক্তিশালী Educational Leadership কাঠামো তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদী Career পথ সুগম করবে।

আরও পড়ুন: ব্যাংকে চাকরি ২০২৬: নিয়োগ প্রক্রিয়া, বেতন ও ক্যারিয়ার গাইড

প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার এই প্রস্তাবটি একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। রাশেদা কে চৌধূরী সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন যে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বুনিয়াদি শিক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা অনুযায়ী যেকোনো পেশাগত (Professional Skills) বা বৃত্তিমূলক কোর্সে যুক্ত হতে পারবে। এটি ভবিষ্যতের দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক Recruitment Solutions প্রদানের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। সরকার ঘোষিত ‘ব্রিজ কোর্স’ বা এক ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পদ্ধতিকে সময়োপযোগী বললেও এর আগে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মজবুত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক অনলাইন এডুকেশন এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে এই ধরনের আমূল সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

অষ্টম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। গণসাক্ষরতা অভিযানের মতে, শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষার পদ্ধতি রিভিউ করার সময় শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরীক্ষা দিতে দিতে ধারাবাহিক মূল্যায়নের গুরুত্ব কমিয়ে ফেলা হয়েছে বলে রাশেদা কে চৌধূরী মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, শিক্ষার্থীরা যদি কেবল গাইড বই-ই পড়বে আর কোচিং সেন্টারেই যাবে, তবে স্কুলের প্রয়োজন কী থাকবে? এই কোচিং ও গাইড বই নির্ভরতা কমাতে সরকারকে দ্রুত দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা এবং সেসব ক্লাসের শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবও সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং শিক্ষা পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ বৃত্তি পরীক্ষার সমালোচনা করে বলেন, অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য পাবলিক পরীক্ষা নয় বরং বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে সেই বিতর্কিত পাবলিক পরীক্ষাকেই ফিরিয়ে আনা হচ্ছে যা শিক্ষার মানের কোনো উন্নয়ন করে না। তিনি আরও বলেন যে, ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভালো শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা দেওয়ার চেয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যারা ভালো নেই, তাদের শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি। এটি একটি সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হয়নি উল্লেখ করে তিনি এটি দ্রুত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

গণসাক্ষরতা অভিযান তাদের ১২ দফা দাবিতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অষ্টম শ্রেণি থেকে তৃতীয় একটি ভাষা শিক্ষা শুরু করা এবং ধাপে ধাপে সব শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর মিড ডে মিল নিশ্চিত করা। এছাড়া শিক্ষা বাজেটের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনি চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে বর্তমান শিক্ষা বরাদ্দের তথ্য দেখে নিতে পারেন। শিক্ষার উন্নয়নে কেবল প্রতিশ্রুতি নয় বরং বিশেষজ্ঞ বা টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই এখন বড় বিষয়।

পরিশেষে বলা যায়, অষ্টম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষা (Class 8 Scholarship Exam) নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। অধ্যাপক মনজুর আহমদের মতে, শিক্ষার উন্নয়নে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয় বরং এর সঠিক বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক অপপ্রভাব বন্ধ করা জরুরি। ২০২৬ সালের আধুনিক বিশ্বে আমাদের শিক্ষার্থীদের কেবল ‘পরীক্ষার্থী’ হিসেবে নয় বরং দক্ষ ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচিত গণসাক্ষরতা অভিযানের এই যৌক্তিক দাবিগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ):

প্রশ্ন ১: প্রাথমিক শিক্ষাকে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করার দাবি জানানো হয়েছে? উত্তর: গণসাক্ষরতা অভিযান প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে সেটিকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে।

প্রশ্ন ২: অষ্টম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে মূল আপত্তি কী? উত্তর: মূল আপত্তি হলো এটি শিক্ষার্থীদের কোচিং ও গাইড বই নির্ভর করে ফেলছে এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রশ্ন ৩: ‘ব্রিজ কোর্স’ বলতে আসলে কী বোঝানো হয়েছে? উত্তর: ‘ব্রিজ কোর্স’ হলো মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষা থেকে কারিগরি শিক্ষায় বা এক ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ সুগম করার একটি পদ্ধতি।

প্রশ্ন ৪: দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে? উত্তর: ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস এবং শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত ভাতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ৫: মিড ডে মিল কেন জরুরি বলা হয়েছে? উত্তর: শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে ধাপে ধাপে সব বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৬: শিক্ষা সংস্কারে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত কী? উত্তর: অধ্যাপক মনজুর আহমদ শিক্ষার উন্নয়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার চাইলেও অভ্যন্তরীণ পরিচালনায় রাজনৈতিক অপপ্রভাব বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। বিস্তারিত তথ্যের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ভিজিট করতে পারেন।

আরও পড়ুনসিভির সাথে কভার লেটার কেন জরুরি? প্রফেশনাল কভার লেটার লেখার পূর্ণাঙ্গ গাইড ও নমুনা